নাটোর জেলার সিংড়া উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকা হুলহুলিয়া গ্রাম—শুনতে রূপকথার মতো, কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশের অন্যতম সফল ও শান্তিপূর্ণ একটি গ্রাম। এখানে নেই মাদক, নেই বাল্যবিয়ে, যৌতুক বা পারিবারিক নির্যাতন। এমনকি শত বছরেও পুলিশ ঢোকেনি কোনো মামলায়। পুরো গ্রাম শতভাগ শিক্ষিত, আর সব উন্নয়ন পরিচালনা করে একটি বিশেষ সংগঠন—হুলহুলিয়া সামাজিক উন্নয়ন পরিষদ।
গ্রামবাসীর মতে, শিক্ষাই বদলে দিয়েছে গ্রামের ভাগ্য। শিক্ষা মানুষের চিন্তা–মননকে বদলে দিয়েছে, তাদের আচরণে এসেছে শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। ফলে গ্রামে কলহ, মামলা, হিংসা বা সহিংসতার মতো কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয় না।
শতভাগ শিক্ষিত আদর্শ গ্রাম হুলহুলিয়া
হুলহুলিয়া গ্রামে ছেলেমেয়েদের জন্য এসএসসি পাশ বাধ্যতামূলক।
যদি কেউ দারিদ্র্যের কারণে সন্তানকে পড়াতে না পারেন, তখন গ্রামে গঠিত ‘দরিদ্র তহবিল কমিটি’ শিক্ষার সব ব্যয় বহন করে। চাকরি পাওয়ার পর সেই টাকা পরিশোধ করতে হয়।
ফোকাস কীওয়ার্ড “আদর্শ গ্রাম হুলহুলিয়া” এখানে মানুষের জীবনে শিক্ষার যে গভীর প্রভাব ফেলেছে, তা আজ বাংলাদেশের অন্য গ্রামগুলোর কাছে চমৎকার দৃষ্টান্ত।
গ্রামে রয়েছে—
- একটি প্রাইমারি স্কুল
- একটি হাইস্কুল
- একটি মাদ্রাসা
- একটি বড় মসজিদ
- একটি গোরস্থান
- একটি ডিজিটাল হাব
- একটি ওয়েবসাইট
গ্রাম থেকে এখন পর্যন্ত বের হয়েছেন—
- ২০০+ জন বিএসসি প্রকৌশলী
- ১০০+ এমবিবিএস ডাক্তার
- ১৭ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক
- ১১ জন বিচারক
- এবং দেশের বিভিন্ন সেক্টরের অসংখ্য সফল ব্যক্তি
এ কারণেই আজ হুলহুলিয়াকে অনেকেই “বাংলাদেশের সবচেয়ে শিক্ষিত গ্রাম” বলে থাকেন।
১০০ বছরে গ্রামে পুলিশ প্রবেশ করেনি—কারণ কী?
গ্রামে নেই কোনো মামলা, নেই কোনো কোর্ট–কাছারির ঝামেলা।
কারণ—গ্রামের মানুষ নিজেরাই তাদের সমস্যা নিজেদের মতো করে সমাধান করেন।
আদর্শ গ্রাম হুলহুলিয়া–র নিজস্ব সংবিধান রয়েছে
যা সবাই মেনে চলে।
গ্রামে বিরোধ হলে প্রথমে পরিবারের সদস্যরা সমাধান করে।
সমাধান না হলে পাড়ার কমিটি।
পাড়ার কমিটি না পারলে সামাজিক উন্নয়ন পরিষদ শেষ সিদ্ধান্ত দেয়।
পরিষদের রায়—সবার জন্য চূড়ান্ত।
এজন্য ১০০ বছরে পুলিশের দরকার হয়নি, কোর্ট–কাছারির দরকার হয়নি।
এ কারণেই “আদর্শ গ্রাম হুলহুলিয়া” এখন সারাদেশে আলোচিত।
কীভাবে শুরু হলো হুলহুলিয়ার বদলে যাওয়া?
হুলহুলিয়ার ইতিহাস আরও অনুপ্রেরণাদায়ক।
১৯১৪-১৫ সালে ভয়াবহ বন্যায় ফসল নষ্ট হয়ে যায়।
এই সংকটে গ্রামের মাতব্বর মছির উদ্দিন মৃধা সকল পরিবারকে নিয়ে সিদ্ধান্ত নেন—
যাদের ঘরে অতিরিক্ত ধান-বীজ আছে, তারা কোনো শর্ত ছাড়াই অন্যকে ধার দেবেন।
এই সিদ্ধান্ত গ্রামে উৎপাদন বাড়ায় এবং মানুষের মনে গড়ে তোলে বিশ্বাস ও একতার শক্ত ভিত্তি।
এরপর ১৯৪০ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন—
হুলহুলিয়া সামাজিক উন্নয়ন পরিষদ
যা আজও গ্রামের সব কাজ, বিরোধ, উন্নয়ন ও সামাজিক অনুষ্ঠান পরিচালনা করছে।
সামাজিক উন্নয়ন পরিষদ—হুলহুলিয়ার শান্তি ও ঐক্যের মূল ভিত্তি
এই পরিষদের নিজস্ব সংবিধান রয়েছে।
গ্রামবাসীর ভোটে পরিষদের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও ২১ সদস্য নির্বাচিত হন।
দুই বছর পর পর নির্বাচন হয়, পুরো প্রক্রিয়াই স্বচ্ছ।
৮টি পাড়ায় রয়েছে নিজস্ব কমিটি—এগুলোকে বলা হয় ‘নিম্ন আদালত’।
ছোটখাটো সমস্যা এই আদালতেই সমাধান হয়ে যায়।
পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আল তৌফিক পরশ বলেন—
“১০০ বছরে কেউ কোর্টে যায়নি, পুলিশ ডাকারও প্রয়োজন হয়নি।
আমরা নিজেরাই সমস্যার সমাধান করি। এটাই হুলহুলিয়ার ইতিহাস।”
হুলহুলিয়ার ডিজিটাল বিপ্লব
২০১৬ সালে তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এখানে স্থাপন করে ডিজিটাল হাব।
এটি পুরোপুরি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এবং রয়েছে—
- ১১টি কম্পিউটার
- প্রজেক্টর
- লাইভ টিভি
- ডিজিটাল ইসিজি রুম
- অনলাইন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা
- গ্রাম বিষয়ক তথ্যসমৃদ্ধ সম্পূর্ণ ওয়েবসাইট
গ্রামের ছাত্রছাত্রীরা এখান থেকে বিনামূল্যে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ পায়।
অনেকেই এখান থেকে শিখে চাকরি পাচ্ছে, ফ্রিল্যান্সিং করছে।
হুলহুলিয়ার সংগঠন: শেকড়, বটবৃক্ষ ও ডায়মন্ড ক্লাব
হুলহুলিয়ায় রয়েছে নানা সামাজিক সংগঠন—
- হুলহুলিয়া ডায়মন্ড ক্লাব (১৯৪২ সাল)
- শেকড়
- বটবৃক্ষ
এসব সংগঠন দ্বারা গ্রামে—
- ছাত্রদের বৃত্তি
- অসহায় পরিবারের সহায়তা
- বেকারদের কর্মসংস্থান
- সাংস্কৃতিক কার্যক্রম
- খেলাধুলার আয়োজন হয়
এ সব কার্যক্রমই “আদর্শ গ্রাম হুলহুলিয়া”–র পরিচয় আরও শক্তিশালী করেছে।
শান্তি ও একতার বার্তা: এক গ্রামে একটাই মসজিদ
গ্রামবাসী স্পষ্ট বলেছেন—
“দুটি মসজিদ হলে গ্রাম ভাগ হয়ে যাবে।
আমরা কখনো বিভাজন চাই না।”
তাদের এই সিদ্ধান্তই গ্রামের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
ওসি ও ইউএনও যা বললেন
সিংড়া থানার ওসি মমিনুজ্জামান বলেন—
“হুলহুলিয়ায় অপরাধ নেই বললেই চলে। বিরোধ হলে তারা নিজেরাই মিটিয়ে ফেলে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাজহারুল ইসলাম বলেন—
“হুলহুলিয়া আদর্শ গ্রাম হিসেবে পরিচিত।
নিজেদের সমস্যা নিজেরাই সমাধান করে—এটাই তাদের শক্তি।”
