শীতের আগাম সবজি হিসেবে বাজারে এসেছে ফুলকপি ও বাঁধাকপি, আর সরবরাহ বাড়তে থাকায় এর দাম এখন আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। দুই সপ্তাহ আগেও খুচরা বাজারে প্রতি পিছ ফুলকপি―বাঁধাকপি ৬০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা ৪০ থেকে ৬০ টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। বাজারে সরবরাহ বাড়তে থাকায় ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে দাম আরও কমে আসবে বলে মনে করছেন কৃষিবিশেষজ্ঞরা।
মৌসুমের ভরা সময়ে এই সবজিগুলোর দাম খুচরা বাজারে ১০ থেকে ২৫ টাকার মধ্যেও নেমে আসে। ফলে সাধারণ ক্রেতাদের জন্য এখন থেকেই বাড়ছে স্বস্তি।
উৎপাদন বেড়েছে, স্থিতিশীল হচ্ছে বাজার
সরকারি তথ্য বলছে, বিগত তিন বছরে দেশে ফুলকপির উৎপাদন বেড়েছে ১৪ শতাংশ এবং বাঁধাকপির উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৪ শতাংশ। উৎপাদন বাড়লেও আগাম মৌসুমে দাম সাধারণত একটু বেশি থাকে, কারণ প্রথম দিকে সবজি ছোট আকারে বাজারে আসে এবং সরবরাহও কম থাকে।
ফুলকপি ও বাঁধাকপির দাম এখন কমতে শুরু করায় বাজারে ইতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে এই সবজির বাজার আগামী কয়েক সপ্তাহে আরও স্থিতিশীল হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ফুলকপি ও বাঁধাকপির বর্তমান উৎপাদন পরিস্থিতি
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ফুলকপির উৎপাদন বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য।
২০২২–২৩ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ১৩ লাখ ১২ হাজার টন।
২০২৩–২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪ লাখ ৮৫ হাজার টনে।
২০২৪–২৫ অর্থবছরে ফুলকপি উৎপাদন বেড়ে ১৫ লাখ টনে পৌঁছেছে।
অন্যদিকে বাঁধাকপির উৎপাদনও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
২০২২–২৩ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ১৩ লাখ ৮০ হাজার টন।
২০২৩–২৪ অর্থবছরে বেড়ে হয় ১৪ লাখ ২৫ হাজার টন।
সর্বশেষ বছরে উৎপাদন হয়েছে ১৪ লাখ ৩৩ হাজার টন।
ফুলকপি চাষের জমির পরিমাণ বাঁধাকপির তুলনায় বেশি হওয়ায় উৎপাদনেও ফুলকপি এগিয়ে।
কৃষকেরা লাভবান, বাড়ছে আগ্রহ
ফুলকপি ও বাঁধাকপি চাষ করে গত দুই বছর কৃষকেরা ভালো দাম পেয়েছেন। তাই এ বছরও অনেক কৃষক অতিরিক্ত জমিতে এই সবজির চাষ করেছেন। আগাম সবজি সাধারণত বেশি দামে বিক্রি হয়, ফলে মৌসুমের শুরুতেই কৃষকেরা ভালো লাভ তুলতে পারেন।
আগাম ফুলকপি ও বাঁধাকপির আকার ছোট হলেও বাজারে চাহিদা বেশি। বর্তমানে বাজারে যেসব ফুলকপি আসছে তাদের ওজন ৪০০ থেকে ৮০০ গ্রামের মধ্যে। আর আগাম বাঁধাকপির ওজন ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম। ভরা মৌসুমে এই সবজিগুলো ১ থেকে ২ কেজি পর্যন্ত বড় হয়।
আগাম সবজি কীভাবে বাজারে আসে
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এইচ এম মনিরুজ্জামান জানান, আগস্টের শেষ বা সেপ্টেম্বর থেকে আগাম ফুলকপি ও বাঁধাকপির চাষ শুরু হয়। প্রথমে বীজতলা তৈরি, পরে ৩০ থেকে ৩৫ দিনের চারা রোপণ করা হয়। সাধারণত চারা লাগানোর পর ৮০ থেকে ৯০ দিনে ফসল বিক্রির উপযোগী হয়।
তবে বাজারে দামের সুবিধা নিতে অনেক কৃষক ১৫–২০ দিন আগেই অপরিপক্ব সবজি তুলেও বিক্রি করেন। এগুলোই আগাম সবজি হিসেবে বাজারে বেশি দামে বিক্রি হয়।
কোন অঞ্চলে বেশি সরবরাহ
চলতি সময়ে যেসব এলাকা থেকে ফুলকপি ও বাঁধাকপির সরবরাহ বেশি আসছে:
যশোর
চুয়াডাঙ্গা
মেহেরপুর
ঝিনাইদহ
রাজশাহী বিভাগের কয়েকটি জেলা
ভরা মৌসুমে ঢাকার আশপাশের সাভার, মানিকগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা থেকেও সরবরাহ বাড়বে বলে জানা গেছে।
দেশে পাওয়া যায় যেসব জাতের ফুলকপি–বাঁধাকপি
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, ফুলকপির জনপ্রিয় জাতগুলো হলো বারি ফুলকপি–১ (রুপা), বারি ফুলকপি–২, বারি ফুলকপি–৩, স্নো হোয়াইট, হোয়াইট ফ্লাশ ২০২০ এবং অটাম জায়ান্ট হাইব্রিড।
বাঁধাকপির ক্ষেত্রে জনপ্রিয় জাতগুলো হলো বারি বাঁধাকপি–১, বারি বাঁধাকপি–২ (অগ্রদূত) এবং আইপিএসএ বাঁধাকপি–১, যা গ্রীষ্মকালেও চাষ করা যায়।
ঢাকার পাইকারি বাজারে দাম: কারওয়ান বাজারের চিত্র
শুক্র এবং শনিবার রাতে কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ট্রাকভর্তি ফুলকপি ও বাঁধাকপি বাজারে ঢুকছে।
আড়তদার আবদুল কাদির ভূইয়া জানান, বর্তমানে তারা ব্যাপারীর কাছ থেকে প্রতি পিছ ফুলকপি কিনছেন ২০–৩০ টাকায়। পাইকারি দরে বিক্রি হচ্ছে ২৫–৩৫ টাকায়। পরে খুচরা পর্যায়ে তা ৪০–৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাঁধাকপির দামও প্রায় একই।
অনেক কৃষক এবার সরাসরি ঢাকা এসে নিজেদের সবজি বিক্রি করছেন। যেমন যশোরের কৃষক আবদুস সাত্তার কারওয়ান বাজারে বাঁধাকপি সরাসরি বিক্রি করে প্রতি পিছ ৩৩ টাকা পেয়েছেন, যা ব্যাপারীদের কাছে দিলে ১৫–২০ টাকার বেশি পাওয়া যেত না।
