বিদ্যুৎ উৎপাদন অর্ধেকে নেমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ ব্যাহত
দেশের সবচেয়ে বড় কয়লাভিত্তিক জ্বালানি প্রকল্প মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রে বড় ধরনের প্রযুক্তিগত বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। বয়লারে ছাই জমে (অ্যাশ স্লাগিং) উৎপাদন নেমে এসেছে ৫০ শতাংশে। এতে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ কমে গেছে, আর আর্থিক ক্ষতি ছাড়িয়েছে ১১৬৯ কোটি টাকা।
মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রযুক্তিগত ত্রুটি: ত্রুটির কারণ এখনো অজানা
চলতি বছরের শুরু থেকে ছাই জমে উৎপাদন ব্যাহত হলেও ত্রুটির সঠিক কারণ চিহ্নিত করা যায়নি।
চুক্তিতে দায় নির্ধারণ না থাকায়—
- ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসটিআইসি দায় নিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে
- প্রকল্প মালিক সিপিজিসিবিএল বলছে এটি যান্ত্রিক ত্রুটি
ত্রুটি অনুসন্ধানের জন্য গঠিত মাতারবাড়ী যৌথ পরামর্শক দল (MJVC) এখনো চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দেয়নি।
ক্যাপাসিটি পেমেন্টেই ক্ষতি ১১৬৯ কোটি টাকা
বয়লারের ত্রুটির কারণে—
- বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে মাত্র ৫০%
- ঘণ্টায় ৪.৮৪ মিলিয়ন মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষতি
- ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বাবদ ক্ষতি ৯৫.৮ মিলিয়ন ডলার
এই ক্ষতির দায় নিতেও অস্বীকৃতি জানাচ্ছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
ত্রুটি মেরামতে ১৩৫ কোটি টাকার পরিকল্পনা কিন্তু সময় লাগবে ২১ মাস
মেরামতের জন্য প্রস্তাব:
- খরচ: ১৩৫ কোটি টাকা
- সময়: ২১ মাস
কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বলছে—
ইপিসি চুক্তিতে এই ব্যয় বহনের বাধ্যবাধকতা নেই।
উল্টো তারা দাবি করছে: মূল্যবৃদ্ধি ৪,৭০০ কোটি টাকা।
ইআরডির বৈঠকে অসন্তোষ: দ্রুত তদন্তের নির্দেশ
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ERD)-এর বৈঠকে কর্মকর্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
অতিরিক্ত সচিব ড. মিজানুর রহমান বলেন—
“ত্রুটির মূল কারণ খুঁজে বের করে জরুরি ভিত্তিতে সমাধান করতে হবে।”
ঠিকাদার বনাম প্রকল্প কর্তৃপক্ষ: অভিযোগ–বিপরীত অভিযোগ
প্রকল্প পরিচালক সাইফুর রহমান জানালেন—
- জানুয়ারি থেকে ছাই জমার সমস্যা শুরু
- এসটিআইসিকে বহুবার অনুরোধ করা হলেও তারা কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি
এসটিআইসির দাবি—
- নিম্নমানের বয়লার ব্যবহৃত হয়েছে
কিন্তু MJVC-এর পরীক্ষায় বয়লার নমুনায় উল্লেখযোগ্য ত্রুটি পাওয়া যায়নি।
জাইকার উদ্বেগ: প্রযুক্তিগত–আর্থিক জটিলতা বাড়ছে
প্রকল্পের প্রধান অর্থায়নকারী জাইকা বলছে—
- প্রযুক্তিগত জটিলতা প্লান্টের কার্যকারিতা ব্যাহত করছে
- ঠিকাদার ও প্রকল্প কর্তৃপক্ষের মধ্যকার দ্বন্দ্ব দ্রুত মেটাতে হবে
- ২০২৬ থেকে দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা (LTSA) চালুর প্রয়োজন আছে
জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব
চুক্তি অনুযায়ী প্রাপ্যতা (Availability) হওয়া উচিত ছিল ৯০%।
কিন্তু বাস্তবে—
- ইউনিট–১: ৪৭%
- ইউনিট–২: ৫৩.৬%
ফলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে: সমস্যা শুধু প্রযুক্তিগত নয়
বিশ্লেষকদের ধারণা—
মাতারবাড়ীর ত্রুটি আসলে
- প্রকল্প ব্যবস্থাপনা দুর্বলতা
- চুক্তি পরিচালনায় জট
- আর্থিক ক্ষতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা
এসবের সামগ্রিক ফল।
দ্রুত সমাধান না হলে কেন্দ্রকে দীর্ঘ সময় অর্ধক্ষমতায় চালাতে হতে পারে, যা গ্রিডে বিদ্যুৎ ঘাটতি বাড়াবে।
মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র: দেশের ব্যয়বহুলতম প্রকল্প
- অবস্থান: মহেশখালী, কক্সবাজার
- ক্ষমতা: ১২০০ মেগাওয়াট
- প্রযুক্তি: আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল
- ইউনিট: ৬০০ মেগাওয়াট × ২
- খরচ: প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা
প্রথম ইউনিটে বাণিজ্যিক উৎপাদন: ডিসেম্বর ২০২৩
দ্বিতীয় ইউনিট: আগস্ট ২০২৪
